বাংলাদেশ—মাত্র পাঁচটি অক্ষরে গঠিত একটি শব্দ, যা কেবল একটি ভূ-খণ্ড নয়, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের দীর্ঘ ত্যাগ, সংগ্রাম এবং গভীর চেতনার প্রতিচ্ছবি। ১৭৫৭ সালের পরাধীনতার গ্লানি থেকে শুরু করে আজকের ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষণ, দিন ও বছর বাংলাদেশের ইতিহাসকে করেছে সমৃদ্ধ, গৌরবময় আবার কখনোবা বেদনাহত। ইতিহাস মানেই স্মৃতি এবং শিক্ষা। কখনো ইতিহাসে স্থান পেয়েছে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ, আবার স্থান পেয়েছে লগি-বৈঠার তাণ্ডব, বিশ্বজিৎ হত্যা, চাঁদাবাজির জন্য পাথর দিয়ে থেতলে হত্যা, বালিশ কান্ড, ক্রসফায়ার, গুম, খুন, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাও।
আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলেই আমরা পেয়েছি আমাদের জাতীয় পরিচয়, নিজস্ব ভূমি, লাল-সবুজের পতাকা এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। স্বাধীনতার খাতায় আমরা অনেক কিছুই অর্জন করেছি—কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রাপ্তির খাতায় আজও যেন অনেক ঘাটতি রয়েছে। আমরা জাতি হিসেবে স্বাধীনতা অর্জন করেছি ঠিকই, কিন্তু তার প্রকৃত সুফল, বিশেষত আত্মমর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা, আজও যেন পূর্ণভাবে পাইনি।
এই স্বাধীন মুসলিম প্রধান দেশে আজ প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতে পারছি? বিশেষত আমরা যারা মুসলমান, তারাই আজ দেশে এবং বিশ্বজুড়ে নানা নির্যাতন ও অবমাননার শিকার হচ্ছি। আজ ইসলাম ও মুসলমানদের টার্গেট করে সবকিছু করা হচ্ছে, যা আমাদের জাতীয় আত্মমর্যাদার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
দুঃখজনকভাবে, সমাজে এক দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড যেমন—কোরআন নিয়ে ব্যঙ্গ, নবীকে নিয়ে অবমাননা, বা দাড়ি-টুপিধারীদের হয়রানি অহরহ ঘটলেও এর সঠিক বিচার হয় না। অথচ অন্য কোনো ধর্মের বিশ্বাস নিয়ে কটূক্তি করলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আরও বিস্ময়কর হলো, কেউ যদি শালীন পোশাকে পর্দা করে চলে, তাহলে সেটি হয়ে যায় ‘ধর্মীয় উগ্রতা’, আর অশ্লীল পোশাকে চলাফেরা করলে বিবেচিত হয় ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ হিসেবে। এ কেমন স্বাধীনতা, আর এ কেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা?
বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে ঘিরে যে চরম বিতর্ক চলছে, তা জাতিকে কঠিন বিভাজনের মুখে ফেলেছে। এক পক্ষ জোরালোভাবে প্রচার করছে যে, স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রতিষ্ঠা করা। এই দাবী আজ দেশের স্বার্থান্ধ রাজনৈতিক দল ও কিছু বুদ্ধিজীবীদের। তাদের দ্বারা ব্যাপকহারে প্রচার করা হচ্ছে। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই নাকি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এর কোনো জোরালো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা বা আপামর গ্রাম বাংলার মানুষ যুদ্ধ করেছিলেন রাজনৈতিক মুক্তি, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, মানবিক মর্যাদা এবং পাকবাহিনীর গণহত্যা ও জুলুম থেকে বাঁচার জন্য। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল জালিম শাসনের কবল থেকে মুক্তি এবং ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধারা কখনোই বলতে পারবেন না যে, তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। বরং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল— “জালিমের কবল হতে দেশকে রক্ষা করে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা—যার ভিত্তি ছিল ঈমান, ন্যায়, মানবিকতা ও দেশপ্রেম।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে কখনোই সেক্যুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেননি। বরং তিনি পাকিস্তানি জালিম শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং সুখী-সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ গড়তে চেয়েছেন। তাঁর বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা: “রক্ত যখন দিয়েছি , রক্ত আরো দেব। কিন্তু এদেশকে মুক্ত করেই ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।”
তবে ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের সংবিধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। তবে এটি ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো, যা সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির চাওয়া পাওয়া ছিল না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজয়ের পর তার আশেপাশের লোকদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যারপরনাই এই সাংবিধানিক রূপ পরে বিতর্কিত হয়েছে এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ও হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ এর সামরিক শাসনামলে তা পরিবর্তিতও হয়েছে। এই পরিবর্তনশীলতাই প্রমাণ করে, ধর্মনিরপেক্ষতা কখনোই আপামর জনতার অবিসংবাদিত যুদ্ধের প্রেরণা ছিল না।
বিশিষ্ট নজরুল গবেষক , শহীদ পরিবারের সন্তান মরহুম কবি মহিউদ্দিন আকবরের বক্তব্য এই সত্যকেই আরও নিশ্চিত করে: “১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ ছিল না। ১৭ তারিখে আমরা সবাই কোরআনের ওপর হাত রেখে শপথ করেছিলাম। জয় বাংলা আর আল্লাহু আকবার উভয় শ্লোগান আর ধ্বনিতে যুদ্ধ করেছি।” (জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার ম্যাগাজিন মাসিক রাহমানি পয়গামের এক সাহিত্য সভায় তিনি এ কথা বলেন)
যাইহোক, ইতিহাসের এই কঠিন সত্য যখন বিকৃতির শিকার, তখন নতুন প্রজন্ম হিসেবে আমরা সত্য জানবো কার কাছে? ঐতিহাসিকভাবে দেশের যেকোনো সংকটে জনগণের আস্থার জায়গা ছিল আলেম সমাজ।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে মাওলানা ভাসানীসহ অসংখ্য আলেম-ওলামা, ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, ইসলাম কখনোই জালিমের পক্ষে নয়।
এক শ্রেণীর মানুষের নিকট আলেম ওলামা মানেই ৭১ সালের পরাজিত শক্তি। তারা মনে করেন ওলামায়ে কেরাম বলতেই রাজাকার, আল-বদর। মুক্তিযুদ্ধে ওলামায়ে কেরামের ভূমিকা নিয়ে জাতির মনে সংশয় ও সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়াই তাদের সাধারন অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। বাংলাদেশের সকল ওলামা মাশায়েখদের প্রতি স্বাধীনতা বিরোধীর খেতাব জুড়ে দেয়া গর্হীত অন্যায়।
যাচাই বাছাই ছাড়া অনাচারের দায় কারো উপর চাপিয়ে দেয়ার পরিনাম শুভ হয় না। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী আলেম প্রজন্ম, যাদের জন্মই মুক্তিযুদ্ধের পরে স্বাধীন বাংলাদেশে, তাদেরকে রাজাকার বলাটা শুধু অন্যায় নয়, পাপও। কেন দাড়ি-টুপি ও লেবাস-পোশাকের জন্য আলেমদের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী মনে করা হয়? এগুলো স্বাধীনতা বিরোধী প্রতীক নয়।
বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায় যে, এ দেশের আলেম সমাজ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে এবং এ দেশের স্বাধীনচেতা মানুষকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করনে অনেক কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে মাওলানা আব্দুল মতিন চৌধুরী সিলেট, মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর, মাওলানা হাবিবুল্লাহ সিলেট, মাওলানা লুৎফর রহমান সিলেট, শাইখুল হাদীস মাওলানা কাজি মুতাসিম বিল্লাহ, শাইখুল হাদীস মাওলানা তাজাম্মুল আলী সিলেট, মাওলানা আরিফ রাব্বানী ময়মনসিংহ, মুফতি নূরুল্লাহ বিবাড়িয়া, মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী ঢাকা, মাওলানা মোস্তফা আজাদ ঢাকা প্রমুখ আলেমের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু আজ বড় আফসোস! এই কঠিন সংকটের সময় আলেম সমাজের একটি বৃহৎ অংশ নীরবতা পালন করছেন। তাদের এই নীরবতার সুযোগ নিয়েই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তারা নতুন প্রজন্মের কাছে বিকৃত ইতিহাস প্রচার করছে। আলেম সমাজ যদি এই মুহূর্তে জেগে না ওঠেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, মূলমন্ত্র ও ইসলামী মূল্যবোধের অবস্থানকে স্পষ্ট না করেন, তবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং ইসলামী মূল্যবোধ হারানোর জন্য তাঁদের নীরবতাও অবশ্যই দায়ী থাকবে।
মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ড ও আত্মপরিচয় এনে দিয়েছে—এটি শতভাগ সত্য। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে এই স্বাধীনতা আমাদের মাঝে বিরামহীন বিতর্ক, হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। ‘স্বাধীনতার স্বপক্ষ’ ও ‘বিপক্ষ’ নামক মিথ্যা বিভাজনের রাজনীতি আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ভাষাকে কেড়ে নিয়েছে।
তাছাড়া, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে আজ ভারতের করাল ছায়ার নিচে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হওয়া, সীমান্ত হত্যা এবং বাণিজ্য-বৈষম্য—সব ক্ষেত্রেই দেশের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে। ব্যাংকের টাকা পাচার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ঋণখেলাপির ভারে দেশের অর্থনীতি আজ জর্জরিত। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পোশাক শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশের স্বার্থান্ধ রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলগুলোর কারণে আজ দেশ একটি ব্যর্থ ও বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে আমাদের দেশপ্রেমিক, নতুন প্রজন্মকে এখনই কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশে আর যেন কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি ফিরে না আসতে পারে সে পথ রুদ্ধ করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই—
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো দল বা মতের একার সম্পত্তি নয়; এটি পুরো জাতির আত্মা। এই চেতনাকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
ধর্মনিরপেক্ষতার নামে যখন ইসলামকে হেয় করার প্রতিযোগিতা চলে, যখন ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধ্বংস করে একটি ধর্মবিহীন সমাজ গড়ার অপচেষ্টা হয়, তখন আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে যদি ইসলামবিরোধী আইন করে মুসলমানদের হেয় প্রতিপন্ন করা হয়, তবে সেই চেতনা দেশের শান্তি আনতে পারে না।
আজ সময় এসেছে সত্যকে প্রকাশ করার। যা বন্দুকের নলে এতকাল স্তব্ধ করে রাখা হয়েছিল। আলেম সমাজ, শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে:
“আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কখনোই ধর্মবিরোধী নয়; এটি ছিল জালিমের বিরুদ্ধে ন্যায়, মানবতা ও ঈমান প্রতিষ্ঠার চেতনা।”
এই সত্যই আমাদের প্রেরণা, আমাদের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা। আমাদের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ মতবাদের সম্পত্তি নয়; এটি ৭ কোটি বাঙালির রক্তে লেখা অর্জন। আজ সেই অর্জনের মর্যাদা রক্ষার জন্য রুখে দাঁড়ানো অনিবার্য।
তথ্যসূত্র:
আওয়ার ইসলাম ডট কম, উইকিপিডিয়া, ইউটিউব, দৈনিক পত্রিকার কলাম সমূহ, মাসিক ছাত্র সংবাদ, মাসিক রাহমানী পয়গাম, মাসিক আল-আমানাহ, ত্রৈমাসিক মাদ্রাসা, আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে-শাকের হোসাইন শিবলী।