এম.কে.জাকির হোসাইন বিপ্লবী
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সময় নিজেই থমকে দাঁড়ায়। চারপাশে নেমে আসে নীরবতা, মানুষের চোখে ভাসে বিস্ময় ও বেদনা, আর জাতির স্মৃতিতে জমা হতে থাকে এক গভীর শূন্যতা। ইতিহাসের এক আপোষহীন কণ্ঠস্বরের বিদায় তেমনই এক মুহূর্ত—যেখানে ব্যক্তির প্রস্থান ছাপিয়ে সামনে আসে একটি যুগের সমাপ্তি। বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় তাই কেবল একজন রাজনীতিকের বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, বহুদলীয় রাজনীতি এবং আপোসহীন অবস্থানের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। আজ চারিদিকে শোকের ছায়া—কারণ এই বিদায় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রাজনীতি যখন আদর্শে ভর করে, তখন তার প্রস্থানও ইতিহাসকে ভারী করে তোলে।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনীতি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও রাষ্ট্রীয় সংগ্রামের ইতিহাস। তিনি কোনো রাজনীতিক পরিবারে জন্ম নেননি, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বেড়ে ওঠেননি। বরং তাঁর রাজনীতিতে আগমন ছিল ইতিহাসের এক নির্মম পরিণতির ফল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন নীরব, প্রচারের আড়ালে থাকা একজন নারী। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। ব্যক্তিগত শোক, নিরাপত্তাহীনতা আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন। এই প্রবেশ ছিল না উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল; ছিল দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নেওয়ার সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ঐতিহাসিকভাবে পুরুষশাসিত। সেই বাস্তবতায় একজন নারীর পক্ষে রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসা ছিল দ্বিগুণ কঠিন। বেগম খালেদা জিয়াকে শুরুতেই নানা কটাক্ষ, অবজ্ঞা ও সন্দেহের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁকে “রাজনীতিতে অযোগ্য”, “স্বামীর নামের ছায়া” কিংবা “অস্থায়ী নেতৃত্ব”—এমন নানা বিশেষণে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেন, নেতৃত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে নয়—সংগ্রামের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়।
আশির দশকে স্বৈরশাসনের অন্ধকার সময় বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক চরিত্রকে স্পষ্ট করে তোলে। সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি ছিলেন রাজপথের এক দৃঢ় মুখ। সেই সময় অনেকেই আপোষের পথ বেছে নিয়েছিলেন—কেউ ক্ষমতার লোভে, কেউ নিরাপত্তার কারণে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া রাজপথ ছাড়েননি। কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব, রাজনৈতিক নিপীড়ন—কিছুই তাঁকে আন্দোলন থেকে সরাতে পারেনি। এখানেই তাঁর আপোষহীন কণ্ঠস্বরের জন্ম; তিনি বুঝেছিলেন, স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে সমঝোতা মানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং এরশাদ সরকারের পতনে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সেই অধ্যায়ে তিনি শুধু একটি দলের নেত্রী ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন স্বৈরশাসনবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু হওয়ার পর তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক মাইলফলক। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি সংসদীয় ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করেন—যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামল নিয়ে বিতর্ক আছে, সমালোচনা আছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে এটিও সত্য যে, তিনি ক্ষমতাকে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করেননি। তিনি রাষ্ট্রকে কোনো একক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত করার পথে হাঁটেননি। তাঁর নেতৃত্বের ধরন ছিল দৃঢ়, কখনো কখনো অনমনীয়—কিন্তু সেটি জন্ম নিয়েছিল রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে, সুবিধাবাদের হিসাব থেকে নয়।
১৯৯৬ সালে ক্ষমতা হারানোর পর তিনি আবার রাজপথে নামেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন, নির্বাচন বর্জন, সংসদে ও সংসদের বাইরে রাজনৈতিক লড়াই—এই সবকিছু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকার বৈধতা হারায়। এই বিশ্বাস তাঁকে বারবার সংঘাতের পথে ঠেলে দিয়েছে, কিন্তু তিনি কখনো পিছিয়ে আসেননি।
২০০১ সালে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তার আরেকটি প্রমাণ। দ্বিতীয়বারের শাসনামলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে। এই সময়েও তাঁর নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় সিদ্ধান্তহীন ছিলেন না। তাঁর সরকার নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
২০০৬ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গভীর সংকট তৈরি হয়, তা বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায়। নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, জরুরি অবস্থা—সব মিলিয়ে রাজনীতি এক অনিশ্চিত পথে প্রবেশ করে। এই সময় তাঁকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। “মাইনাস টু” ফর্মুলার মাধ্যমে তাঁকে এবং আরেক শীর্ষ নেত্রীকে রাজনীতির বাইরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু ইতিহাস আবারও দেখেছে—বেগম খালেদা জিয়া আপোষ করেননি। তিনি কারাবরণ করেছেন, মামলা মোকাবিলা করেছেন, কিন্তু রাজনীতি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেননি।
২০০৯ সালের পর থেকে তাঁর জীবনে শুরু হয় এক দীর্ঘ নীরবতার অধ্যায়। একের পর এক মামলা, দীর্ঘ কারাবাস, শারীরিক অসুস্থতা—সব মিলিয়ে তাঁকে কার্যত রাজনীতির সক্রিয় মঞ্চ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। কিন্তু এখানেই তাঁর চরিত্রের আরেকটি দিক উন্মোচিত হয়—নীরব প্রতিরোধ। তিনি বক্তৃতা দেননি, মিছিলের নেতৃত্ব দেননি; কিন্তু তাঁর নাম, তাঁর অস্তিত্ব, তাঁর অবস্থান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক স্থায়ী চাপ হিসেবে রয়ে গেছে। প্রতিপক্ষের রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন এক অনিবার্য প্রসঙ্গ।
বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবন ছিল বেদনাবহ। স্বামী হত্যার শোক, সন্তানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা, এক পুত্রের অকাল মৃত্যু—এই সব ট্র্যাজেডি তাঁকে ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং ব্যক্তিগত শোককে তিনি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। এ কারণেই তিনি কেবল একজন রাজনীতিক নন; তিনি হয়ে উঠেছেন সংগ্রামী নারীর প্রতীক—যিনি দুঃখকে দুর্বলতা নয়, দৃঢ়তায় রূপান্তর করেছেন।
আজ যখন ইতিহাসের এক আপোষহীন কণ্ঠস্বরের বিদায়ের কথা বলা হয়, তখন চারিদিকে শোকের ছায়া নেমে আসে শুধু আবেগের কারণে নয়। এই শোক জন্ম নেয় একটি উপলব্ধি থেকে—আমরা এমন এক রাজনীতিককে বিদায় জানাচ্ছি, যিনি রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার অঙ্ক হিসেবে দেখেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি মানে অবস্থান নেওয়া, ঝুঁকি নেওয়া, প্রয়োজনে একা দাঁড়ানো।
তাঁর সমালোচকেরা বলেন, তিনি আপোষহীনতার কারণে রাজনৈতিক সংকট আরও তীব্র করেছেন। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি পাঠ হলো—সব সংকট সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান হয় না। কোনো কোনো সময় আপোষই সংকটকে দীর্ঘায়িত করে। বেগম খালেদা জিয়া সেই কঠিন সত্যটি বিশ্বাস করতেন। তিনি জানতেন, এই বিশ্বাস তাঁকে একা করবে, তাঁকে বিতর্কিত করবে—তবুও তিনি অবস্থান বদলাননি।
চারিদিকে শোকের ছায়া আজ শুধু তাঁর সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁর রাজনীতির সঙ্গে একমত ছিলেন না, তবুও তাঁর আপোষহীনতাকে শ্রদ্ধা করেন। কারণ ইতিহাসে বিরল সেই চরিত্র—যাঁরা ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেন না, সুবিধার বিনিময়ে অবস্থান বদলান না।
এই বিদায় আমাদের জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার মুহূর্তও। আমরা কি এমন রাজনীতি গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে আদর্শের মূল্য আছে? আমরা কি এমন নেতৃত্ব তৈরি করতে পেরেছি, যারা ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারে? বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় এই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এনে দেয়।
ইতিহাস একদিন নিরপেক্ষ চোখে তাঁর জীবন ও রাজনীতি বিশ্লেষণ করবে। তখন তাঁর ভুলগুলোও লেখা হবে, তাঁর সীমাবদ্ধতাও আলোচিত হবে। কিন্তু একই সঙ্গে ইতিহাস স্বীকার করতেই বাধ্য হবে—তিনি ছিলেন আপোষহীন। তিনি ছিলেন অনমনীয় এক কণ্ঠস্বর, যিনি সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলাননি; বরং সময়কে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
আজ চারিদিকে শোকের ছায়া। এই শোক কেবল চোখের জলের নয়; এটি একটি আদর্শের বিদায়ের শোক, একটি রাজনৈতিক ধারার অবসানের শোক। বেগম খালেদা জিয়া চলে গেছেন—কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্ন, তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি, তাঁর আপোষহীন অবস্থান ইতিহাসের পাতায় রয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস পড়বে, তখন তারা দেখবে—একটি নাম বারবার ফিরে আসে, আলোচনায় আসে, বিতর্কে আসে। সেই নাম—বেগম খালেদা জিয়া।
ইতিহাসের এক আপোষহীন কণ্ঠস্বরের বিদায় তাই নীরব নয়। এই বিদায় উচ্চকণ্ঠে বলে যায়—সময় চলে যায়, মানুষ চলে যায়, কিন্তু আপোষহীন অবস্থান ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে।