• বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন
Headline
জগন্নাথপুরের নিখোঁজ হওয়া যুক্তরাজ্য প্রবাসীর মরদেহ জকিগঞ্জের হাওড় থেকে উদ্ধার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ সংসদে পাস করে আইনে রূপান্তর করা জরুরী, নারী মৈত্রীর মতবিনিময় সভায় বক্তৃতারা মোবাইল ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতার ঘোষণায় আপত্তি, সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি-বুলুর কবিতা: ঋণ ডিমলার শোভানগঞ্জ গ্রামে নিজের গাছ নিজে কেটে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর পাঁয়তারা ক্ষমতা ও অন্ধকারের এক নীল নকশা: ‘এপস্টিন ফাইল’ এবং আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় ইনসাইডার স্টোরি নওগাঁর মহাদেবপুরে ট্রাকচাপায় একই পরিবারেরসহ পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যু এলাকাজুড়ে শোক, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী পরিবেশ ডিমলায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেড়ে গাছ কেটে মিথ্যা অভিযোগ দিলো থানায় প্রতিপক্ষরা খেজুর গাছ প্রতীক হস্তান্তর ডোমার–ডিমলায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান তারেক রহমানের কবিতা: অযথা

ক্ষমতা ও অন্ধকারের এক নীল নকশা: ‘এপস্টিন ফাইল’ এবং আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় ইনসাইডার স্টোরি

তুফান ইনিস্টিউট / ৯ Time View
Update : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদক

​জেফরি এপস্টিন—নামটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিউইয়র্কের অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে ক্যারিবিয়ান সাগরের নির্জন দ্বীপ। কিন্তু সেই জৌলুসপূর্ণ দৃশ্যপটের আড়ালে যে কত গভীর এবং পঙ্কিল এক জগত লুকিয়ে ছিল, তা হয়তো সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত। ২০২৪ সালের শুরুতে আদালত যখন কয়েক হাজার পৃষ্ঠার গোপন নথি বা ‘এপস্টিন ফাইল’ উন্মোচনের নির্দেশ দেয়, তখন তা কেবল একটি যৌন কেলেঙ্কারির গল্প হয়ে থাকেনি; বরং তা হয়ে ওঠে বিশ্বরাজনীতি ও কর্পোরেট জগতের ক্ষমতার অপব্যবহারের এক জীবন্ত দলিল।

​প্রশ্ন উঠেছে, একজন সাধারণ গণিত শিক্ষক থেকে হয়ে ওঠা এই ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইটান’ কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের নিজের আঙুলের ইশারায় নাচাতেন? আজ সেই অন্ধকার অধ্যায়ের দীর্ঘ ব্যবচ্ছেদ করব আমরা।

​১. নীল নকশার স্থপতি: এপস্টিনের ‘প্রভাব’ তত্ত্ব

​এপস্টিনের জাদুকরী ক্ষমতার মূলে ছিল তাঁর সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান। তিনি জানতেন, যারা ক্ষমতার চূড়ায় থাকেন, তারা সবসময় নতুন কিছু এবং গোপনীয়তার সন্ধান করেন। এপস্টিন সেই সুযোগটিই নিতেন। তিনি বিলিয়নেয়ারদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতেন, বিজ্ঞানীদের গবেষণায় অর্থায়ন করতেন এবং রাজনীতিবিদদের জন্য বিলাসবহুল ভ্রমণের আয়োজন করতেন। কিন্তু তাঁর এই আতিথেয়তার পেছনে লুকানো ছিল এক মারাত্মক ফাঁদ।

​অনুসন্ধানী নথিপত্র এবং ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, এপস্টিন তাঁর দ্বীপ এবং বাসভবনগুলোতে গোপনে ক্যামেরা স্থাপন করে রাখতেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো ধারণ করে তিনি সেগুলোকে ‘বিমার’ মতো ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, কেউ যদি তাঁর বিরুদ্ধে যেতে চাইত, তবে সেই গোপন ভিডিওগুলোই হয়ে উঠত তাঁর ধ্বংসের কারণ। একেই গোয়েন্দা পরিভাষায় বলা হয় ‘কম্প্রোম্যাট’।

​২. কুশীলবদের তালিকা ও সংশ্লিষ্টতার গভীরতা

​এপস্টিন ফাইলের প্রতিটি পাতা যখন উল্টানো হয়, তখন সেখানে বেরিয়ে আসে এমন সব নাম যা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে।

​প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও রাজতন্ত্রের সংকট: ব্রিটেনের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিষয়টি এখন আর কেবল অভিযোগের পর্যায়ে নেই। নথিতে তাঁর সংশ্লিষ্টতা এতই স্পষ্ট যে, তাঁকে রাজকীয় উপাধি ও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে বাকিংহাম প্যালেস। ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জুফ্রের সেই ঐতিহাসিক ছবিটি—যেখানে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর হাত তাঁর কোমরে ছিল—তা আজও ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাসে এক বড় কলঙ্ক হয়ে আছে।

​প্রেসিডেন্টদের ছায়া: মার্কিন রাজনীতিতে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বিল ক্লিনটনের নাম এই ফাইলে বারবার আসাটা ইঙ্গিত দেয় যে, এপস্টিন কোনো রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না; তাঁর আদর্শ ছিল কেবল ‘ক্ষমতা’। ক্লিনটনের ‘ললিটা এক্সপ্রেস’ বিমানে ২৬ বারের বেশি ভ্রমণের তথ্য এবং ট্রাম্পের মার-এ-লাগো ক্লাবে এপস্টিনের অবাধ যাতায়াত প্রমাণ করে যে, আমেরিকার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর কতটা প্রভাব ছিল।

​কর্পোরেট মোগলদের নৈতিক পতন: বিল গেটসের মতো জনহিতৈষী ব্যক্তিত্ব যখন এপস্টিনের সাথে নিয়মিত নৈশভোজে অংশ নিতেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। বিল গেটস পরবর্তীতে একে বড় ভুল হিসেবে স্বীকার করলেও, মেলিন্ডা গেটসের বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হিসেবে এই সম্পর্কটিকে দেখা হয়। এছাড়াও বার্কলেস বা জেপি মরগানের মতো বড় বড় ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের সাথে এপস্টিনের গভীর সখ্যতা আর্থিক খাতের দুর্নীতির দিকটিও উন্মোচন করে।

​৩. বিজ্ঞানের মোড়কে বিকৃতি

​এপস্টিন নিজেকে একজন ‘বৈজ্ঞানিক হিতৈষী’ হিসেবে প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। তিনি বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং বা জিনতত্ত্ববিদদের তাঁর দ্বীপে আমন্ত্রণ জানাতেন। আসলে এটি ছিল তাঁর একটি ঢাল। তিনি চেয়েছিলেন সমাজের সবচেয়ে উচ্চশিক্ষিত ও সম্মানিত ব্যক্তিদের সাথে নিজের নাম জড়িয়ে নিজের ভাবমূর্তি স্বচ্ছ করতে। এই কৌশলটি দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে গ্রেফতারের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।

​৪. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রহস্যজনক মৃত্যু

​২০১৯ সালের আগস্টে ম্যানহাটনের কারাগারে এপস্টিনের রহস্যজনক মৃত্যু এই গল্পের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। যখন তদন্তকারীরা মনে করছিলেন যে এপস্টিন এবার বড় বড় সব নামের মুখোশ খুলে দেবেন, ঠিক তখনই তাঁর ‘আত্মহত্যা’র সংবাদ আসে। একজন অত্যন্ত হাই-প্রোফাইল বন্দি হিসেবে তাঁর কক্ষের সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো থাকা এবং রক্ষীদের ঘুমিয়ে পড়ার বিষয়টি আজও জনমনে হাজারো প্রশ্নের জন্ম দেয়। অনেকেই মনে করেন, এপস্টিনকে বাঁচিয়ে রাখা অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তির জন্যই বিপজ্জনক ছিল।

​৫. গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট: আমরা কী শিখলাম?

​এপস্টিন ফাইল আমাদের সামনে একটি কদর্য সত্য তুলে ধরেছে—আইন সবার জন্য সমান নয়। যে অপরাধের জন্য সাধারণ মানুষের আজীবন কারাদণ্ড হতো, সেখানে এপস্টিন বছরের পর বছর পার পেয়ে গেছেন কেবল তাঁর অর্থের জোরে। তবে এই ফাইলগুলো উন্মোচনের ফলে একটি ইতিবাচক দিকও তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী নারীদের লড়াই প্রমাণ করেছে যে, যত বড় ক্ষমতাধরই হোক না কেন, সত্য একদিন না একদিন বেরিয়ে আসবেই।

​শেষ কথা

​জেফরি এপস্টিন ফাইল কেবল একটি নথির স্তূপ নয়; এটি একটি বিশাল দর্পণ, যেখানে আধুনিক সভ্যতার ক্ষমতার কুৎসিত চেহারাটি প্রতিফলিত হয়। এই রহস্যের শেষ হয়তো এখানেই নয়, কারণ অনেক নথি এখনো জনসমক্ষে আসেনি। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, ক্ষমতার করিডোরে যে অন্ধকার খেলাটি এপস্টিন খেলতেন, তার রেশ আরও কয়েক দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে অনুভূত হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

More News Of This Category

সমাজচেতনা ফাউন্ডেশনের প্রচারণা

bdit.com.bd