আর এম তুফান
“খেলা যে লেভেলেই চলুক, সরকার গঠন করা দল যদি বিরোধী দলের সাথে সখ্যতা না রাখে, লিখে রাখেন দুই বছরও টিকে থাকতে পারবে না।” সাবিত রিজওয়ানের এই বক্তব্য আসলে ক্ষমতার স্থায়িত্ব নিয়ে নয়, রাজনীতির কাঠামো নিয়ে একটি গভীর পর্যবেক্ষণ। তিনি এখানে সরকার পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করছেন না, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার এক মৌলিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছেন, যেখানে বিরোধিতা ছাড়া শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর একটি হলো বিরোধী কণ্ঠ। বিরোধী দল মানে শুধু সরকারের সমালোচক নয়, তারা নীতিনির্ধারণের বিকল্প ভাবনা হাজির করে, ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে এবং শাসনকে আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়। কিন্তু যখন সরকার বিরোধী শক্তিকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন রাজনীতি সংলাপ থেকে সরে গিয়ে প্রতিহিংসার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই অবস্থায় স্থিতিশীলতা নয়, বরং অস্থিরতাই নিয়ম হয়ে ওঠে।
রিজওয়ানের কথার যুক্তি এখানেই দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলছেন না যে সরকারকে বিরোধী দলের কাছে নতি স্বীকার করতে হবে, বরং বলছেন, সহাবস্থান ছাড়া শাসন সম্ভব নয়। বিরোধী দলকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করলে সরকার হয়তো আপাতভাবে শক্তিশালী দেখায়, কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে ওঠে ভঙ্গুর। কারণ তখন রাজনীতির সংঘাত সংসদে নয়, রাস্তায় নেমে আসে, প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তির মধ্যে লড়াই শুরু হয়।
বাংলাদেশসহ অনেক দেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, যেখানে সরকার বিরোধী কণ্ঠকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতরে জায়গা না দিয়ে বাইরে ঠেলে দেয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা তৈরি হয় না। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিরোধী শক্তিকে অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে শাসন কাঠামোর ভেতর থেকেই অসন্তোষ জমতে থাকে, যা একসময় সংকটের রূপ নেয়।
রিজওয়ানের বক্তব্যে “খেলা যে লেভেলেই চলুক” কথাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে বোঝা যায়, তিনি ক্ষমতার অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে তর্কে যাচ্ছেন না, বরং ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তার মতে, ক্ষমতায় যাওয়ার পথ যাই হোক, ক্ষমতায় থাকার শর্ত হলো রাজনৈতিক সহনশীলতা। এই সহনশীলতা না থাকলে শক্ত সরকারও ধীরে ধীরে একা হয়ে পড়ে, আর একাকীত্বই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।
তার বক্তব্যের আরেকটি দিক হলো, তিনি সময়সীমা দিয়ে কথা বলেছেন। “দুই বছরও টিকবে না” কথাটি ভবিষ্যদ্বাণীর মতো শোনালেও মূলত এটি একটি সতর্ক সংকেত। এর মানে এই নয় যে সরকার দুই বছরের মাথায় পতিত হবেই, বরং এর মানে হলো, বিরোধী কণ্ঠকে দমন করে দীর্ঘস্থায়ী শাসন সম্ভব নয়, এই বাস্তবতা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে।
রিজওয়ানের বক্তব্য তাই সরকারবিরোধী স্লোগান নয়, বরং রাজনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতার ওপর একটি বিশ্লেষণ। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, যেখানে সংলাপ নেই, সেখানে সংকট অনিবার্য; যেখানে সহাবস্থান নেই, সেখানে স্থায়িত্ব কল্পনামাত্র। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি দমন নয়, বরং সহনশীলতা, সংলাপ এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি।
এই বক্তব্য শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই সামনে আনে, সরকার কি বিরোধী দলকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে সংলাপের পথে হাঁটবে, নাকি শত্রু হিসেবে দেখে সংঘাতের পথে যাবে? এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে শাসনের স্থায়িত্ব নয় শুধু, গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যতও।
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি: আহমেদ হোসাইন ছানু। সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ রেজন মিয়া। লাইব্রেরি: তুফান ইনিস্টিউট। ইমেইল: sabit.rizwan@yahoo.com। কার্যালয়: রংপুর, বাংলাদেশ।
© ২০২৫ সময়প্রবাহ। লেখার দায় লেখকের; স্বত্ব কর্তৃপক্ষের। ভুল বা বিতর্কে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।